লন্ডনের গিল্ড হলে গতকাল কমনওয়েলথ বিজনেস ফোরাম আয়োজিত ‘এশিয়ান লিডারস রাউন্ড টেবিল : ক্যান এশিয়ান কিপ গ্রোয়িং’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : পিআইডিবাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দেওয়া নানা সুবিধার কথা তুলে ধরে সেগুলোকে কাজে লাগাতে বিশ্বের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের এদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বুধবার স্থানীয় সময় বিকেলে লন্ডনে উচ্চ পর্যায়ের এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মের সভাপতিত্বে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বিশ্বের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের এই গোলটেবিল বৈঠক হয়। বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য আমি আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি, বিশেষ করে, বিশ্বের যেসব ব্যবসায়ী নেতা এখানে উপস্থিত আছেন তাঁদের। আমি আপনাদের নিশ্চয়তা দিচ্ছি, এশিয়ার সবচেয়ে বেশি এফডিআই (প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ) প্রণোদনা দেওয়া দেশে আপনারা আমাদের সরকারের কাছ থেকে পূর্ণ সহযোগিতা পাবেন।’

প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করিম জানান, কমনওয়েলথ দেশগুলোর ১৩ জন সরকারপ্রধান গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী কমনওয়েলথভুক্ত সব দেশে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি খাতে একযোগে কাজ করার লক্ষ্যে কমনওয়েলথের বাস্তব সহযোগিতা কামনা করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি যে কমনওয়েলথভুক্ত সকল দেশে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি খাত একযোগে কাজ করার ক্ষেত্রে কমনওয়েলথ বাস্তব সহযোগিতা দিতে পারে।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশ কমনওয়েলথ ক্ষুদ্র ও দ্বীপ রাষ্ট্র (এসআইডিএস), এলএলডিসি, আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারে বিপুল সম্ভাবনা দেখতে পায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ৯ কোটি মধ্যবিত্ত ভোক্তা রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে ইইউ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও জাপানের বাজারে শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার। যে কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে এশিয়ার পরবর্তী শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে রিব্র্যান্ডিং করছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, টেকসই শিল্প বিনিয়োগের লক্ষ্যে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানসহ বিদ্যুৎ উৎপাদন তাঁর সরকারের শীর্ষ অগ্রাধিকার হয়ে আছে। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, এটি হচ্ছে সার্বিক অর্থে স্বাধীনতা, মর্যাদা ও সুযোগের বিষয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আমরা আমাদের অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তির ব্যবহার জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকি।’

প্রধানমন্ত্রী জানান, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৫৬.৭ শতাংশ, যা ২০১৫ সালে ২২.৪ শতাংশে নেমে এসেছে। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে দেশে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও টেকসই উন্নয়নের জন্য আমার সরকারের গৃহীত নীতি-কৌশলগুলো বাস্তব ফল দিচ্ছে।’

স্থিতিশীল এশিয়ার জন্য পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ান : এর আগে সকালে এক অনুষ্ঠানে এশিয়ার দেশগুলোকে আরো শান্তিপূর্ণ, উন্নত ও স্থিতিশীল করতে পারস্পরিক সেতুবন্ধ তৈরি এবং যোগাযোগ বাড়াতে এশীয় নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, স্থিতিশীলতার মাঝেই এশিয়ার ভবিষ্যৎ নিহিত। এ জন্য আমাদের আন্ত সম্পর্ক ও যোগাযোগ এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের মতবিনিময় ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠার প্রয়াসের প্রয়োজন রয়েছে।’

লন্ডনের গিল্ড হলে কমনওয়েলথ বিজনেস ফোরাম আয়োজিত ‘এশিয়ান লিডারস রাউন্ড টেবিল : ক্যান এশিয়ান কিপ গ্রোয়িং’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার সিইও জেরিন দারুওয়ালার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, মালয়েশিয়াসহ এশিয়ার কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুগো সুইরি অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের সীমান্তের মধ্যকার সমৃদ্ধি ও সমতা প্রবৃদ্ধি বয়ে আনবে এবং সম্মিলিত বিকাশের মাধ্যমে আমরা শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল অঞ্চল গড়ে তুলতে পারি।’ তিনি বলেন, এশিয়ার দেশগুলোকে প্রবৃদ্ধিতে কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, বরং এশিয়ার অঞ্চলব্যাপী আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সমৃদ্ধির পাশাপাশি বৈষম্যও সৃষ্টি করছে। এ প্রসঙ্গে তিনি এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতার হুমকি হিসেবে সন্ত্রাসবাদ, সংঘাত, আর্থিক অভিঘাত ও অন্যান্য চ্যালেঞ্জের সঙ্গে এ অঞ্চলের অগ্রযাত্রার পথে আরো অনেক বাধা-বিপত্তি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শেখ হাসিনা এশিয়ার প্রতিভা বিকাশে তরুণ, নারী এবং সর্বোপরি নাগরিকদের ওপর আরো বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আন্ত কমনওয়েলথ বাণিজ্য প্রসারে প্রধানমন্ত্রীর ৭ দফা প্রস্তাব : একই হলে অন্য আরেকটি সেশনে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্ত কমনওয়েলথ ব্যবসা, বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনার উন্নয়নের জন্য সাত দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। ‘বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উদ্ভাবনী সহযোগিতা বিষয়ে কমনওয়েলথের ভূমিকা’ শীর্ষক ওই বৈঠকে তিনি বাণিজ্য প্রশাসন আরো উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ করে তুলতে কমনওয়েলথ দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা অবশ্যই বাণিজ্য প্রশাসন উন্মুক্ত, আইনভিত্তিক, স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায্যতা নিশ্চিত করব।’ তিনি বলেন, আন্ত কমনওয়েলথ বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনার লক্ষ্যে দেশগুলোকে অবশ্যই অভিন্ন সুযোগ-সুবিধা জোরদার করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী এ লক্ষ্যে সাত দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এগুলো হলো—১. সদস্য রাষ্ট্রগুলোর শিল্প সম্ভাবনা ও উৎপাদনশীলতার খাতভিত্তিক সমীক্ষা প্রয়োজন। ২. ছড়িয়ে থাকা বিনিয়োগ সম্ভাবনাসহ অভিন্ন বিনিয়োগনীতি, নির্দেশনা ও কৌশল গ্রহণ। ৩. বাণিজ্য সহায়ক সুযোগ-সুবিধার উন্নয়ন এবং পিটিএ ও এফটিএর অশুল্ক বাধা কমিয়ে আনা। ৪. সেবা বাণিজ্যের জন্য উদার শাসন এবং স্বতন্ত্র পেশার সেবা সুবিধার জন্য খোলাবাজার চালু। ৫. প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ যাতায়াত এবং সরকারি ও বেসরকারি ক্যাটাগরিতে নির্দিষ্ট লোকদের জন্য ভিসা সহজীকরণ। ৬. অবকাঠামো ও যোগাযোগ প্রকল্প গ্রহণ এবং ৭. এসএমই এবং ব্লু ইকোনমি খাতসহ উত্কৃষ্ট কেন্দ্র ও প্রতিষ্ঠানের সহায়তা এবং উন্নয়ন, আরঅ্যান্ডডি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তহবিল গঠন।

কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে। তাদের বৃহত্তম সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আন্ত কমনওয়েলথ বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনী শক্তির পরিচালনায় কমনওয়েলথকে অবশ্যই এই বিপুল মেধাবীকে কাজে লাগাতে হবে। এ জন্য আমাদের অবশ্যই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে হবে।’

তারেককে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে : এর আগে গত মঙ্গলবার লন্ডনে ভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের (ওডিআই) এক সেমিনারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারেক রহমানকে আদালতে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। আমরা অবশ্যই একদিন তাকে দেশে ফিরিয়ে নেব।’ বিএনপি নেতা তারেক রহমানের মতো সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য যুক্তরাজ্যের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ব্রিটেন একটি মুক্ত দেশ। যে কেউ এ দেশে আশ্রয় প্রার্থনা করতে পারে। তবে তারেক রহমান তো একজন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। তার অপরাধের জন্য আদালত তাকে সাজা দিয়েছেন। আমি বুঝতে পারছি না, যুক্তরাজ্য কেন একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে আশ্রয় দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা তাকে দেশে ফিরিয়ে নিতে যুক্তরাজ্য সরকারের সঙ্গে কথা বলছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাইকোর্ট একটি দুর্নীতি মামলায় তিন বছর আগে তারেককে সাত বছরের সাজা দিয়েছেন। এ ছাড়া কয়েকটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। কয়েকটি ফৌজদারি ও দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি হওয়ায় তাঁকে পলাতক ঘোষণা করা হয়েছে। এই পলাতক আসামিকে কী করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হলো সে প্রশ্নও তোলেন প্রধানমন্ত্রী।

২৫তম কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলন শুরু আজ : ২৫তম কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের বৈঠক (সিএইচওজিএম) আজ বৃহস্পতিবার লন্ডনে শুরু হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও আরো ৫২টি দেশের সরকারপ্রধানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। দুই দিনব্যাপী এই শীর্ষ সম্মেলন স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় বাকিংহাম প্যালেসে শুরু হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *